History
Trending

জাপানের লোকগাথার যত প্রেতেরা

জাপানের লোকগাথার যত প্রেতেরা

 

ওনি আর ইউরেই হাজার হাজার বছর ধরে জাপানের সংস্কৃততে গুরুত্ববহ অবস্থান ধরে রেখেছে। মানুষের মতো আকৃতির শিংওয়ালা দানবকে বলা হয় ওনি। তাদেরকে বলা হয় অনিষ্টকারী। পাপী মানুষেরা পরকালে গিয়ে এক নির্দিষ্ট নরক এই ওনি তে পরিণত হবেন। সেখানে গিয়ে হয়ে উঠবেন দানবের মতোই নিষ্ঠুর এবং হিংস্র। তাদের সংখ্যা নরকে থাকবে অসংখ্য। কিন্তু এই পৃথিবীতে থাকা অবস্থায় যারা এতো পাপ করেছে যা ক্ষমার অযোগ্য, তারা জীবিত অবস্থাতেই ওনির রূপ নিয়েছে।

ইউরেইকে আসলে ভূত বলা যায়। জাপানে মানুশদের বিশ্বাস পরকালে আত্মার প্রত্যাশিত গন্তব্য হল ‘ইয়োমিনোকুনি’। কিন্তু সেখানে যাওয়ার রাস্তা এতটা সহজ নয়, অতি দুর্গম এবং কষ্টসাধ্য। তাই কাছের কেউ মারা গেলে পরিবার এবং পরিচিতদের পালন করার জন্য কিছু নির্ধারিত রীতি রয়েছে। মৃত মানুষকে পরকালের সেযাত্রা সহজতর করতেই এই রীতি গুলো পালন করা হয়। রীতি গুলো সফলভাবে পালন করতে পারলে আত্মা মুক্তি পায় এবং জীবিতদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে।

কিন্তু যাদের মৃত্যু অস্বাভাবিক ভাবে ঘটে কিংবা যাদের শেষকৃত্য ঠিকভাবে পালন করা হয় না তারা দুনিয়াতেই অতৃপ্ত আত্মা হিসেবে থেকে যায়। ইহকাল ও পরকালের মধ্যে সেসব আত্মাগুলো আটকে থাকে। এসব অতৃপ্ত আত্মারাই ইউরেই নামে পরিচিত। বিভিন্ন কালে এই ওনি ও ইউরেই কে নিয়ে অসংখ্য গল্পের রচনা ঘটেছে এবং এখনো সে ধারাবাহিকতা বজায় আছে। উকিওনা

অপরূপ সুন্দরী উকি-ওনা, তার বাস বরফাচ্ছাদিত পাহাড়ি অঞ্চলে। সে যেকোনো পথিককে চোখের ইশারায় বিভ্রান্ত করে দেয়। তুষারপাত বা ঝড়ের সময় পথিকদের হারিয়ে যাওয়ার কারণ তারই ইশারা। তবে কখনো কখনো কোলে একটি শিশু নিয়ে হাজির হয় সে। পথিকদের অনুরোধ করে শিশুটিকে কোলে নিতে এবং কোলে নিলেই পথিকরা বরফে পরিণত হয়।

তবে সে যে হিংস্র না তা নয়। কখনো কখনো সে হামলা করে সরাসরি জনপথে। ভেঙে চুরমার করে ঘরবাড়ি। ঘুমন্ত আদিবাসী কে হত্যা করে। কখনো শুধু মেরেই তৃপ্তি পাই। আবার কখনো ভ্যাম্পায়ারের মতো শিকারের রক্ত চুষে নেই। কথিত আছে প্রাচীনকাল দুই কাঠুরে মোসাকু আর মিনোকিচি বসবাস করত। মোসাকু ছিলেন খুবই বয়স্ক এবং মিনোকিচি তরুণ। এক শীতে প্রচন্ড ঝড়ের কারণে তাদের ঘরে ফেরা হলো না। তারা জঙ্গলে খোঁজাখুঁজি করে এক পতিত কুঁড়েঘর পেল। এবং অতিরিক্ত ক্লান্তির কারনে দ্রুত ঘুমিয়ে পরলো সেখানেই। সন্ধার দিকে মিনোকিচি চোখ খুললো।

খুলেই এক ভয়ানক কান্ড দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল। সো দেখলো এক তরুণী, তার গায়ের সাদা পোশাক, মোসাকু এর উপর নিঃশ্বাস ফেললো এবং সাথে সাথেই বৃদ্ধ বরফে জমে মারা গেল। এবার মিনোকিচির দিকে আসতে থাকলো তরুণী। কিন্তু কেন যেন নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়ে থেমে গেল সে এবং বললো

” তোমাকেও বৃদ্ধের মত হত্যা করতে পারতাম। কিন্তু তুমি সুদর্শন তরুণ। তুমি বেঁচে থাকো কিন্তু তুমি যদি কখনো আমার কথা কাউকে বলো, তবে কেউই সেদিন তোমাকে আর রক্ষা করতে পারবে না। “

জাপানের লোকগাথার যত প্রেতেরা

বেশ কয়েক বছর পর ওয়ুকি নামের এক তরুণীকে বিয়ে করে মিনোকিচি। সন্তান-সন্তাদি নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল তাদের। কিন্তু দিন গড়াতে থাকলেও তরুনীর বয়স বাড়ছিল না। একদিন সন্তানেরা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর স্ত্রীকে ডাকে মিনোকিচি। সেই অনেক বছর আগের দেখা অদ্ভুত ঘটনা তাকে বলে। কেবলই কোন স্বপ্ন ছিল না কোনো দানবী ছিল, আসলে সে কথা সে জানেনা। তবুও সে সেই বরফে মাঝে দেখা তরুনীর সাথে নিজের স্ত্রীর মিলের কথা বলে। এরপর ওয়ুকি শোনামাত্রই দাঁড়িয়ে যায়। এবং বলে

 ” আমি সেই তরুণীই। কিন্তু তোমাকে সেই ঘটনার কথা কাউকে বলতে আমি বারণ করেছিলাম। কিন্তু তবুও তোমাকে আমি হত্যা করলাম না। শুধুমাত্র আমার সন্তানদের জন্য। তুমি তাদের দেখে রেখো “

 

এই বলেই হাওয়াতে মিলিয়ে যায় উকি-ওনা। তারপর থেকে আর কেউ তার দেখা পাইনি।

কিয়োহিমে

জাপানের সম্রাট তাইকো তখন শাসনের দায়িত্বে। আনচিন নামের এক সুদর্শন যাজকের কি প্রদেশ আগমন ঘটে। জাপানের তরুণ যাজকের প্রেমে পড়ে যায় প্রাদেশিক গভর্নরের মেয়ে কিয়োহিমে। একজন মেয়ে হওয়া সত্বেও রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে কিয়োহিম দেখা করতে যেত। কিন্তু আনচিন খুব তারাতারিই তাকে প্রতারণা করে। লুকিয়ে প্রেমার্ত কিয়োহিমেকে ফেলে রেখে চলে যাওয় সিদ্ধান্ত নেয় সে।কষ্ট নিয়েই আনচিনের পিছনে কিয়োহিমে ছুটতে থাকে।

এবং দেরি হলেও প্রেমিককে সে ধরে ফেলে। কিন্তু আনচিন প্রেমিকাকে পেয়ে আনন্দিত তো হয়ই না বরং অবিরাম মিথ্যা বলতে থাকে। কিয়োহিমেকে স্থবির রেখে সে পালিয়ে যায়। এরপর আর সহ্য করেনা কিয়োহিমে। প্রতারণার যন্ত্রণায় এবং ক্রোধের তার শরীর দানবীয় সাপের রূপ নেয়। আগুন বের হতে থাকে মুখ থেকে। আনচিনকে সে ধাওয়া করে। আনচিন নৌকায় নদী পার হয়ে যায় এবং নৌকার মাঝিকে সে বারণ করে যেন মাঝি তার পিছুধাওয়াকারীকে কোনভাবেই নদী পার না করে দেয়। তবে তাতে লাভ হয় না কিছুই। কিয়োহিমে নদী পার হয় সাপের রূপ ধরেই।

আনচিন ভয় পেয়ে পাশের মন্দিরের অতিকায় ঘন্টার নিচে লুকিয়ে পরে। দেখতে না পেলেও কিয়োহিমে তার গায়ের গন্ধ ঠিক বুঝতে পারে। সে ঘণ্টাটা পেচিয়ে ধরে একের পর এক আঘাত হানতে থাকে লেজ দিয়ে এবং মুখ থেকে বের করতে থাকে আগুন। এভাবে আনচিনের মৃত্যু হয়।

জাপানের লোকগাথার যত প্রেতেরা

শুতেনতোজি

জাপানের লোককথা অনুসারে শুতেন- তোজি হলেন শ্রেষ্ঠ তিনজন দানবের অন্যতম। তার শরীরটা লাল এবং সে ৫০ ফুট লম্বা তার পঞ্চাশটা শিং এবং চোখ পনেরোটা নিয়ে এক ভয়ানক মূর্তির অধিকারী সে। সে অবশ্য জন্ম থেকেই ওনি ছিল না।জাপানের মানুষরা এ কথা জানেন। হাজার হাজার বছর আগে জাপানের তোয়ামা অঞ্চলের এক শিশু ছিলো সে। তার বাবার ড্রাগণ কিন্তু মা ছিলেন মানুষ। তাতে অবশ্য সমস্যা ছিলোনা কোনো। সমস্যা ছিল তার অসম্ভব বুদ্ধিতে এবং অস্বাভাবিক শক্তিতে। দানব সন্তান হিসেবে সবাই তাকে ক্রমশ এড়িয়ে চলতে থাকলো।

তার বয়স ৬ হওয়ার পর তার মা পর্যন্ত তাকে ছেড়ে চলে গেল। এতিম অবস্থায় একজন যাজকের সান্নিধ্য পায় সে। কিন্তু তার অস্বাভাবিকতা সেখানকার তার সমবয়সীদেরও মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠলো। ক্রমে সে সাধুদের জন্য যা নিষেধ, সে মদে আসক্ত হয়ে পড়ল। এবং এই তার প্রবল আসক্তির কারণে তার নাম দেয়া হলো শুতেন-তোজি।জাপানের মন্দিরে একরাতে উৎসব ছিল। সেখানে মদ্যপ হালে শুতেন-তোজি ঢুকে পড়ে। সমবয়সীদের ভয় দেখাতে থাকে থাকে ওনির মুখোশ পড়ে। কিন্তু রাত যখন শেষ তখন সে আতঙ্ক তার উপরেই চেপে বসে। অনেক টানাটানি করে সে কোনমতেই মুখোশ টা খুলতে পারে না। ভয়, লজ্জা আর গুরু কর্তৃক অপমানিত হয়ে সে জাপানের পাহাড়ে চলে যায়।

চলে যায় দূরে, জাপানের থেকে সবার থেকে দূরে। তবে জাপানের লোকালয় থেকে খাবার আর মদ নিয়ে আসে মাঝে মাঝেই। ক্রমে তাকে ঘিরে একটি অপরাধী চক্র গড়ে ওঠে জাপানের। সে অলৌকিক বিদ্যা আর কালো জাদুর চর্চা করতে থাকে। এবং তার শিষ্যদেরও শেখাতে থাকে এবং ধীরে ধীরে তার পুরো আস্তানার সবাই ওনিতে পরিণত হতে থাকে। সুযোগমতো পথিক ও জনপথে তারা হামলা করতো। রক্ত পান করতো কুমারী মেয়েদের। মিনামাতোর নেতৃত্বে তার বহুদিন পরে একদল নায়ক শুতেন-তোজির শিবির দখল করে আর সেই কালো যুগের অবসান ঘটে।

 উজি নো হাশিমে

জাপানের কিফুনের মন্দিরে হঠাৎই ধ্যানে মগ্ন হল রাজদরবারের এক সম্ভ্রান্ত রমণী। তার ধ্যান চললো সাত দিনব্যাপী! তার ভেতরে জ্বলছিল ঈর্ষা ও হিংসার আগুন। ‘শয়তানি শক্তি চাই,’ তার শুধু এই একটি প্রার্থনা। সে প্রতিশোধ চাই। তার শত্রুদের থেকে কঠিন প্রতিশোধ। তার উপাসনা একাগ্রতায় সন্তুষ্ট হলেন কিফুনে মন্দিরের কামি। তাকে কিছু পদ্ধতি শেখালেন আন বললেন তাকে ২১ দিন টানা ডুব দিতে হবে উজি নদীতে। কামির কথামতো রমণী একটি নির্জন স্থান বেছে নিলো। সে তার মাথায় পাঁচটি শিং বানালো তার চুল দিয়ে এবং সিঁদুর মেখে সারা শরীর করলো লাল।জাপানের লোকগাথার যত প্রেতেরা

ওনিদের মত করে সাজলো সে। রমণী দাঁতে দুইটা আর মাথায় তিনটা বাতি বেঁধে ছুটে চলল নদীর পানে। অন্ধকারে উনি ভেবে সে রাতে তাকে যেই দেখেছে আতঙ্কে মারা গেছে সেই ২১ দিন নদীর পানিতে ডুব দিয়ে থেকে কিফুনের কামির কথা অনুসারে তার বাসনা পূর্ণ হলো।সে জীবন্ত দানবীর রূপ পেল। তার নাম হলো হাশিহিমে। ক্ষমতা পেয়েই সর্বপ্রথম সেই শত্রুদের কাছে গেল প্রতিশোধ নিতে। পুরুষদের সামনে নারী হয়ে আর নারীদের সামনে গেলো পুরুষের রূপ ধরে। সারা শহর তার আতঙ্কে তটস্থ। তার অনেক দিন পর চারজন সঙ্গী নিয়ে ইয়োরিমিতসু আসেন, বীর সুনাও ছিলেন তাদের একজন। এই সুনাও কৌশলে হাশিহিমের আক্রোশ থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়।

 ইয়ামায়ুবা

বৃদ্ধা ডাইনি ইয়ামায়ুবা জাপানের পাহাড়ি এলাকায় বা বনে থাকে। সে জন্ম থেকে মানুষ হলেও পাপের ভারে দানবের রূপ পেয়েছে। ইয়ামায়ুবা শব্দ দ্বারা বোঝায় বৃদ্ধাদের একটি শ্রেণীকে। সে তার মাথার শিং ও লম্বা দাঁত থাকলেও সাধারণত প্রকাশ্যে আনে না। সে রাস্তার ধারে একা বাস করে। আর রাতে যদি কোনো পথিক খাবার বা ঘুমের জন্য আশ্রয় চাই, তাদের জায়গা দেয়। রাত গভীর হলে পথিক যখন ঘুমে অচেতন তখনই সে সত্তিকারের রূপ ধরে। তাদের মজা করে খায়। তবে অবাধ্য বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর সময় ইয়ামায়ুবার গল্পগুলো বেশিরভাগ বলা হত। যারা কোনো কৌশল করে ইয়ামায়ুবার হাত থেকে পালিয়ে বেঁচেছে, বলে মানুষ বিশ্বাস করে তারাই এসব গল্পের প্রচার করতো।

কথিত আছে যদি কোনো নারী কোনো খারাপ কাজ করে লোকালয় থেকে পালায়, তবে বহু বছর পর সে ইয়ামায়ুবার রুপ নেয়। দুর্ভিক্ষ আর দারিদ্র্যের স্বাভাবিকভাবেই জীবন-যাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। যেসব পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি তাদের খাদ্য সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়েই অনেকে তাদের।পরিবারের বৃদ্ধ কিংবা কণিষ্ঠ সদস্যকে জঙ্গলে ফেলে আসে। যাতে অন্যরা বাঁচতে পারে। তবে ফেলে দিয়ে আসা নারীরা ক্রোধে দানবের রুপে পরিণত হয়। তাদের শরীর কুঁকড়ে যায়, মুখটা সরু হয়ে যায় এবং চুল হয়ে যায় সাদা। তারা চর্চা করে জাদুবিদ্যা এবং মানুষ খায়।

সবিশেষ

লোকজ ধর্মকথা যুক্তিনির্ভর হয় না। সাধারণত হতে পারে না। মানুষের চরিত্রের চিরসত্য দিক ভীতি আর আশা। কিন্তু কৌতুহলকে তো ভয় দ্বারা দাবিয়ে রাখা সম্ভব না। এ কারণে মানুষ ঝড়, পাহাড়, অন্ধকার কিংবা নদীতে অস্বাভাবিক মৃত্যু কে ভয় পায়। একইসাথে তার ব্যাখ্যা করতে চাই নিজস্ব জ্ঞানে মাধ্যমে। এরই সাথে প্রতীকায়িত হয় তাদের চিন্তা আচার এবং সর্বোপরি ভয়। যার কারণে তাদের ধর্ম এবং বিজ্ঞান সব এই উপকথাই। রাতে হাটতে গিয়ে বা বরফের ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের কি হয়েছে সেটার উত্তর অন্তত সান্তনা হিসেবে পাওয়া যায় এসব গল্পে। জাপানের মাটিতে শিন্টো ধর্মের বিজ।

হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্মের বাতাস গেছে ভারত থেকে। চিনা সংস্কৃতি ও যোগ হয়েছে। ফলে অজস্র বিচিত্র সব অলৌকিক সত্ত্বার সূতিকাগার হয়ে উঠেছে জাপান। ধর্মের বাড়াবাড়ি পাশে রেখে এই সহাবস্থানের ঐতিহ্য দেখে যে কেউই হবে।

Thanks For Visit.

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button